রক্তচাপ পরীক্ষা করার সঠিক নিয়ম
ডিজিটাল অটোমেটিক মেশিনের সাহায্যে ঘরে বসে রক্তচাপ বা ব্লাড প্রেসার পরিমাপ করা বর্তমানে খুবই জনপ্রিয় এবং সুবিধাজনক। তবে সঠিক পদ্ধতি না জানলে রিডিংয়ে ভুল আসতে পারে, যা বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে। নির্ভুল ফলাফল পেতে প্রস্তুতির পর্যায় থেকে শুরু করে মাপার সময় পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপ সঠিকভাবে অনুসরণ করা অত্যন্ত জরুরি। নিচে রক্তচাপ মাপার সঠিক নিয়মাবলী বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
১. পরিমাপের পূর্ব প্রস্তুতি
রক্তচাপ পরিমাপের আগে শরীর ও মনকে শান্ত রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। কোনো কারণে শরীর উত্তেজিত থাকলে রক্তচাপ সাময়িকভাবে বেড়ে যেতে পারে। এই অবস্থায় রক্তচাপ পরীক্ষা না করাই ভালো। রক্ত চাপ পরিমাপ করার আগে যে সকল বিষয় ভালোভাবে লক্ষ্য রাখতে হবে তা হচ্ছেঃ-
- পর্যাপ্ত বিশ্রাম: রক্তচাপ মাপার অন্তত ৫ থেকে ১০ মিনিট আগে সব ধরনের কাজ বন্ধ করে স্থির হয়ে আরামদায়কভাবে বসুন। এই সময়টুকু শরীরকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসতে সাহায্য করে।
- খাবার ও ধূমপান বর্জন: রক্তচাপ মাপার অন্তত ৩০ মিনিট আগে চা, কফি বা ক্যাফেইন জাতীয় পানীয় পান করবেন না। এছাড়া ধূমপান করা বা ভারী ব্যায়াম করা থেকেও বিরত থাকতে হবে, কারণ এগুলো রক্তচাপের রিডিং বাড়িয়ে দিতে পারে।
- মূত্রাশয় খালি করা: আপনার যদি প্রস্রাবের বেগ থাকে, তবে পরিমাপের আগেই বাথরুম সেরে নিন। মূত্রাশয় পূর্ণ থাকলে শরীরের স্নায়বিক চাপের কারণে রক্তচাপ কিছুটা বেশি আসতে পারে।
২. বসার ভঙ্গি ও শারীরিক অবস্থান
আপনি কীভাবে বসে আছেন, তার ওপর রক্তচাপের মান অনেকাংশে নির্ভর করে। ভুল ভঙ্গিতে বসলে রিডিংয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। তাই রক্ত চাপ পরিমাপের আগে সঠিক ভঙ্গিতে বসতে হবে। এমন অবস্থায় শাররীক অবস্থান যেমন রাখতে হবেঃ-
- পিঠের অবস্থান: একটি পিঠওয়ালা চেয়ারে সোজা হয়ে আরাম করে বসুন। পিঠ যেন চেয়ারের হেলান দেওয়ার জায়গার সাথে ঠিকমতো লেগে থাকে।
- পায়ের অবস্থান: বসার সময় পা ক্রস করে বা এক পায়ের ওপর অন্য পা তুলে বসবেন না। পা দুটি মাটির সাথে সমান্তরালভাবে এবং স্থিরভাবে রাখুন।
- হাতের অবস্থান: আপনার হাতটি একটি টেবিল বা সমতল পৃষ্ঠের ওপর রাখুন। খেয়াল রাখবেন যেন হাতের অবস্থান আপনার হৃদপিণ্ড বা হার্টের উচ্চতার সাথে সমান থাকে। হাত খুব উঁচুতে বা খুব নিচুতে থাকলে সঠিক রিডিং পাওয়া সম্ভব নয়।
৩. কাফ (Cuff) বাঁধার সঠিক পদ্ধতি
সঠিক নিয়মে মেশিন ব্যবহার করলে রেজাল্ট ভালো পাওয়া যায়। ডিজিটাল বিপি মেশিন এর কাপড়ের কাফটি হাতের সঠিক স্থানে এবং সঠিক মাপে বাঁধা খুব জরুরি। যেভাবে কাফ বাধতে হবেঃ-
- সঠিক স্থান: কাফটি কনুইয়ের ভাঁজ থেকে ঠিক ১-২ ইঞ্চি উপরে বাঁধুন।
- চামড়ার সংস্পর্শ: কাফটি সরাসরি চামড়ার ওপর বাঁধার চেষ্টা করুন। খুব পাতলা কাপড় থাকলে তার ওপর বাঁধা যেতে পারে, তবে সোয়েটার বা মোটা কাপড়ের ওপর কাফ বাঁধলে রিডিং ভুল আসবে । তাই মোটা কাপড় সরিয়ে বা হাতা গুটিয়ে নেওয়া ভালো।
- টাইট বা ঢিলে ভাব: কাফটি খুব বেশি টাইট করে বাঁধবেন না, আবার যেন খুব ঢিলে না থাকে। আদর্শ মাপ হলো কাফ বাঁধার পর তার ভেতর দিয়ে যেন আপনার দুটি আঙুল অনায়াসে ঢোকানো যায়।
৪. মেশিন চালনা ও রিডিং নেওয়া
উপরোক্ত সকল প্রস্তুতি শেষ হলে মেশিন চালু করার পালা। মেশিন চালু করার পরে যে সকল কাজ করতে হবে তার ধাপ সমূহ হচ্ছেঃ-
- পরিমাপ শুরু: মেশিনের ‘Start’ বাটনটি চাপুন। মেশিনটি যখন কাফে বাতাস ঢোকাবে এবং পরিমাপ করবে, তখন একদম স্থির হয়ে বসে থাকুন।
- নীরবতা পালন: রক্তচাপ মাপার সময় কথা বলবেন না বা শরীর নাড়াচাড়া করবেন না। কথা বললে হৃদপিণ্ডের ওপর চাপ পড়ে যা রক্তচাপের মানকে প্রভাবিত করতে পারে।
- ফলাফল বোঝা: পরিমাপ শেষে মেশিনটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাফের বাতাস ছেড়ে দেবে এবং স্ক্রিনে তিনটি সংখ্যা দেখাবে:
- Systolic (সিস্টোলিক): এটি হৃদপিণ্ড যখন সংকুচিত হয় তখন ধমনীর রক্তচাপ বা উপরের মান।
- Diastolic (ডায়াস্টোলিক): এটি হৃদপিণ্ডের বিশ্রামের সময়কার চাপ বা নিচের মান।
- Pulse (পালস): এটি আপনার নাড়ির স্পন্দন বা হৃদস্পন্দনের গতি।
৫. নির্ভুল ফলাফল পেতে বিশেষ টিপস
অনেক সময় একবার মেপে সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। এর জন্য সঠিক মানের রক্ত চাপ পরিক্ষা করার মেশিন নির্বাচিত করতে হবে। তাই কিছু কৌশল অবলম্বন করা যেতে পারে:
- পুনরায় পরীক্ষা: যদি প্রথমবার রিডিং খুব বেশি বা অস্বাভাবিক মনে হয়, তবে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। ২-৩ মিনিট শান্ত হয়ে বসে থেকে পুনরায় মাপুন। পর পর দুই বা তিনবারের রিডিং নেওয়ার পর তার গড় মানটিই আপনার প্রকৃত রক্তচাপ হিসেবে গণ্য হবে।
- ব্যাটারির যত্ন: ডিজিটাল মেশিন ব্যাটারির শক্তিতে চলে। যদি মেশিনের ব্যাটারি দুর্বল থাকে, তবে তা প্রায়ই ভুল বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ রিডিং দেয়। তাই নিয়মিত ব্যাটারি পরিবর্তন করুন বা চার্জ চেক করুন।
রক্তচাপের মান ও করণীয়
পরিমাপের পর আপনি রক্তচাপের কোন পর্যায়ে আছেন তা জানা জরুরি:
| শারীরিক অবস্থা | সিস্টোলিক (উপরের) | ডায়াস্টোলিক (নিচের) |
| স্বাভাবিক | ১২০ mmHg এর নিচে | ৮০ mmHg এর নিচে |
| উচ্চ রক্তচাপ | ১৪০ mmHg বা তার বেশি | ৯০ mmHg বা তার বেশি |
| নিম্ন রক্তচাপ | ১০০ mmHg বা তার নিচে | ৭০ mmHg এর নিচে |
সতর্কতা
যদি আপনার রক্তচাপ নিয়মিতভাবে ১৪০/৯০ mmHg এর ওপরে থাকে, তবে তা উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে নিজে নিজে ওষুধ না খেয়ে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সঠিক জীবনযাপন ও নিয়মিত পরীক্ষার মাধ্যমে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

Add comment