ডেঙ্গু একটি ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত সংক্রমিত এডিস ইজিপ্টাই মশার কামড়ের মাধ্যমে মানুষের শরীরে ছড়ায়। বাংলাদেশে বর্ষাকাল ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে ডেঙ্গুর ঝুঁকি সাধারণত বেড়ে যায়। তবে বছরের অন্য সময়েও ডেঙ্গু হতে পারে। ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এডিস মশার বংশবিস্তার বন্ধ করা, মশার কামড় থেকে নিজেকে রক্ষা করা এবং বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা। এ জন্য প্রত্যেক ব্যক্তির পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও স্থানীয় জনগণের সচেতন হওয়া জরুরি।
এডিস মশার বংশবিস্তার রোধ
এডিস মশা সাধারণত বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পরিষ্কার বা তুলনামূলক স্বচ্ছ পানিতে ডিম পাড়ে। তাই মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা ডেঙ্গু প্রতিরোধের অন্যতম প্রধান উপায়।
১. জমে থাকা পানি অপসারণ
বাড়ির ভেতরে ও বাইরে এমন অনেক পাত্র থাকে, যেখানে অল্প পানি জমলেও এডিস মশা বংশবিস্তার করতে পারে। তাই নিচের স্থানগুলো নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে।
- ফুলের টব ও টবের নিচের পানির পাত্র।
- পরিত্যক্ত বোতল, ক্যান, প্লাস্টিকের কাপ ও প্যাকেট।
- ডাবের খোসা, ভাঙা বালতি ও পুরোনো টায়ার।
- ছাদ, বারান্দা ও উঠানে জমে থাকা পানি।
- ফ্রিজ বা এসির পানি জমার ট্রে ও ড্রেনের আশপাশ।
- নির্মাণাধীন ভবনের গর্ত, পানির ট্যাংক ও অন্যান্য জলাধার।
- ছাদের নালা, পাইপ ও বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের পথ।
করণীয়: সপ্তাহে অন্তত একবার বাড়ি ও আশপাশ ভালোভাবে পরীক্ষা করুন। তবে পানি জমতে দেখলে এক সপ্তাহ অপেক্ষা না করে সঙ্গে সঙ্গে অপসারণ করুন। এডিস মশার জীবনচক্র সম্পন্ন হতে সাধারণত প্রায় ৭–১০ দিন লাগতে পারে, তাই নিয়মিত পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২. পানি সংরক্ষণের পাত্র ঢেকে রাখা
অনেক বাড়িতে পানির সংকটের কারণে বালতি, ড্রাম, কলস বা ট্যাংকে পানি জমিয়ে রাখা হয়। এসব পাত্র খোলা থাকলে মশা সেখানে ডিম পাড়তে পারে।
এ জন্য যা করতে হবেঃ-
- পানির পাত্র সব সময় শক্তভাবে ঢেকে রাখুন।
- ঢাকনা এমনভাবে দিন, যাতে মশা প্রবেশ করতে না পারে।
- পানির পাত্রের ভেতরের দেয়াল ও কিনারা নিয়মিত ব্রাশ দিয়ে ঘষে পরিষ্কার করুন।
- পাত্রের পানি পরিবর্তনের সময় পুরোনো পানি ফেলে দিয়ে পাত্র পরিষ্কার করুন।
- পানির ট্যাংকের ঢাকনা ও বায়ু চলাচলের মুখে উপযুক্ত মশা-প্রতিরোধক জাল ব্যবহার করুন।
শুধু পানি বদলানো যথেষ্ট নয়, কারণ মশার ডিম পাত্রের ভেতরের দেয়ালে লেগে থাকতে পারে।
৩. ফুলের টব ও গাছের যত্ন
বাড়িতে ফুলের গাছ বা শোভাবর্ধক গাছ থাকলে টবের নিচে জমে থাকা পানি নিয়মিত সরিয়ে ফেলুন। পানিতে রাখা গাছের পাত্রও ঘন ঘন পরিষ্কার করুন।
- টবের নিচে পানি জমতে দেবেন না।
- গাছের জন্য প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি দেবেন না।
- ফুলদানির পানি নিয়মিত পরিবর্তন করে পাত্রের ভেতর পরিষ্কার করুন।
- পানিতে জন্মানো গাছের পাত্র মশার প্রজননস্থল হচ্ছে কি না পরীক্ষা করুন।
৪. ছাদ, বারান্দা ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা
বৃষ্টির পর ছাদ, বারান্দা, সিঁড়ি, গ্যারেজ ও উঠানে পানি জমেছে কি না পরীক্ষা করুন। ড্রেন ও নালা পরিষ্কার রাখুন, যাতে পানি সহজে বেরিয়ে যেতে পারে।
অপ্রয়োজনীয় জঞ্জাল, পরিত্যক্ত পাত্র, টায়ার ও প্লাস্টিকের সামগ্রী সরিয়ে ফেলুন। যেসব পাত্র ফেলে দেওয়া সম্ভব নয়, সেগুলো উল্টে রাখুন বা ঢেকে রাখুন।
মনে রাখতে হবে, শুধু ঘর পরিষ্কার রাখলেই হবে না; বাড়ির আশপাশ ও প্রতিবেশী এলাকার জমে থাকা পানিও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
এডিস মশার কামড় থেকে বাঁচার উপায়
এডিস মশা সাধারণত দিনের বেলায় বেশি সক্রিয় থাকে, বিশেষ করে সকাল ও বিকেলের দিকে। তবে দিনের অন্য সময়েও কামড়াতে পারে। তাই শুধু রাতে নয়, দিনের বেলাতেও সতর্ক থাকা জরুরি।
১. মশারি ব্যবহার করা
ঘুমানোর সময় মশারি ব্যবহার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে।
- দিনের বেলায় ঘুমালেও মশারি ব্যবহার করুন।
- রাতে ঘুমানোর সময় মশারি টানিয়ে ঘুমান।
- মশারির কোনো ছিদ্র থাকলে তা মেরামত করুন।
- মশারির প্রান্ত ভালোভাবে গুঁজে দিন, যাতে মশা ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে।
- শিশুদের খাট বা দোলনার জন্য উপযুক্ত মশারি ব্যবহার করুন।
মশারি ব্যবহারের পাশাপাশি অন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও নিতে হবে, কারণ এডিস মশা দিনের বেলাতেও কামড়ায়।
২. শরীর ঢাকা পোশাক পরা
বাইরে যাওয়ার সময় এমন পোশাক পরুন, যাতে শরীরের বেশির ভাগ অংশ ঢাকা থাকে।
- পুরো হাতা শার্ট পরুন।
- লম্বা প্যান্ট বা পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত ঢাকা পোশাক পরুন।
- সম্ভব হলে মোজা ও জুতা ব্যবহার করুন।
- শিশুদের স্কুলে বা বাইরে যাওয়ার সময় উপযুক্ত পোশাক পরান।
ঢিলেঢালা পোশাক পরলে শরীরের সঙ্গে মশার সরাসরি সংস্পর্শ কমে। তবে পোশাকের পাশাপাশি ত্বকে মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করা প্রয়োজন হতে পারে।
৩. মশা তাড়ানোর ক্রিম বা স্প্রে ব্যবহার
ত্বকে ব্যবহারের উপযোগী মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করলে এডিস মশার কামড়ের ঝুঁকি কমানো যায়।
কার্যকর উপাদানের মধ্যে রয়েছে—
- DEET: মশা প্রতিরোধে বহুল ব্যবহৃত একটি উপাদান।
- Picaridin: মশা প্রতিরোধে কার্যকর আরেকটি উপাদান।
- IR3535: নির্দিষ্ট পণ্যে ব্যবহৃত একটি মশা প্রতিরোধক উপাদান।
- লেবেল অনুযায়ী উপযুক্ত ঘনত্বের লেমন ইউক্যালিপটাস তেলজাত প্রতিরোধক: কিছু পণ্যে ব্যবহৃত হয়।
ব্যবহারের সময় কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখুন:
- পণ্যের নির্দেশনা অনুযায়ী ত্বকের উন্মুক্ত অংশে ব্যবহার করুন।
- চোখ, মুখ, ক্ষতস্থান ও জ্বালাযুক্ত ত্বকে লাগাবেন না।
- শিশুদের ক্ষেত্রে বয়স অনুযায়ী উপযুক্ত পণ্য নির্বাচন করুন। শিশুদের হাত বা চোখ-মুখের আশপাশে নিজে থেকে প্রতিরোধক লাগাবেন না।
- নির্দেশনায় যতবার পুনরায় ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে, তা অনুসরণ করুন।
- সানস্ক্রিন ব্যবহার করলে সাধারণত আগে সানস্ক্রিন এবং পরে মশা প্রতিরোধক লাগানো হয়।
শুধু প্রাকৃতিক বা সুগন্ধিযুক্ত তেলের ওপর নির্ভর না করে কার্যকারিতা প্রমাণিত মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করাই ভালো।
৪. দরজা ও জানালায় মশা নিরোধক জাল লাগানো
ঘরের ভেতরে মশা প্রবেশ কমাতে দরজা ও জানালায় উপযুক্ত জাল লাগান। জালে কোনো ছিদ্র বা ফাঁক আছে কি না নিয়মিত পরীক্ষা করুন।
- সন্ধ্যায় দরজা-জানালা খোলা রাখলে সতর্ক থাকুন।
- ঘরে মশা ঢুকে গেলে তা দূর করার ব্যবস্থা নিন।
- প্রয়োজনে নির্দেশনা অনুযায়ী অনুমোদিত মশা নিয়ন্ত্রণের পণ্য ব্যবহার করুন।
৫. মশা তাড়ানোর কয়েল ও বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহারে সতর্কতা
মশার কয়েল, বৈদ্যুতিক ভ্যাপোরাইজার বা অন্যান্য মশা নিয়ন্ত্রণের পণ্য ব্যবহার করা যেতে পারে, তবে পণ্যের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।
- কয়েল জ্বালালে আগুন লাগার ঝুঁকি এড়িয়ে চলুন।
- বন্ধ ঘরে ধোঁয়া জমতে দেবেন না।
- শিশু ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত ব্যক্তিদের আশপাশে ধোঁয়াযুক্ত পণ্য ব্যবহারে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করুন।
- কীটনাশক স্প্রে করার সময় লেবেলে উল্লেখিত নিরাপত্তা নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
এ ধরনের পণ্য মশা কমাতে সহায়তা করলেও জমে থাকা পানি অপসারণের বিকল্প নয়।
প্রাকৃতিক উপায়ে মশা নিয়ন্ত্রণ
অনেকে নিমপাতা, লেমনগ্রাস, ল্যাভেন্ডার, ইউক্যালিপটাস বা অন্যান্য সুগন্ধিযুক্ত উদ্ভিদ ব্যবহার করেন। এসব উদ্ভিদের কিছু নির্যাস নির্দিষ্ট প্রস্তুতিতে মশা প্রতিরোধ করতে পারে। তবে শুধু গাছ ঘরে রাখলেই ডেঙ্গুর মশা থেকে নির্ভরযোগ্য সুরক্ষা পাওয়া যায় এমন পর্যাপ্ত প্রমাণ নেই। তবে এই উপায়ে মশার নিয়ন্ত্রণ করতে যে সকল বিষয় মনে রাখতে হবেঃ-
- শুধু নিমপাতা বা লেমনগ্রাসের ওপর নির্ভর করবেন না।
- ঘরে সুগন্ধিযুক্ত গাছ রাখলেও মশারি ও কার্যকর প্রতিরোধক ব্যবহার করুন।
- ঘরে তৈরি অপরিশোধিত তেল সরাসরি ত্বকে লাগাবেন না; এতে অ্যালার্জি বা ত্বকের জ্বালা হতে পারে।
- শিশুদের ত্বকে এসেনশিয়াল অয়েল ব্যবহারের আগে বিশেষ সতর্ক থাকুন।
সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হলো জমে থাকা পানি অপসারণ, পানি সংরক্ষণের পাত্র ঢেকে রাখা এবং কার্যকর মশা প্রতিরোধক ব্যবহার। এই তিনটি ব্যবস্থা একসঙ্গে গ্রহণ করা।
বাড়ির বাইরে ও কর্মক্ষেত্রে ডেঙ্গু প্রতিরোধ
ডেঙ্গু প্রতিরোধ শুধু ব্যক্তিগত বিষয় নয়। বাড়ি, অফিস, স্কুল, বাজার ও নির্মাণস্থলসহ সব জায়গায় মশার বংশবিস্তার বন্ধ করতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিষ্কার ও পরিচ্ছন্ন রাখা
স্কুল-কলেজের ছাদ, পানির ট্যাংক, ফুলের টব ও খেলার মাঠ পরীক্ষা করতে হবে। শিক্ষার্থী ও কর্মীদের নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে।
নির্মাণস্থল পরিষ্কার রাখা
নির্মাণাধীন ভবনের গর্ত, ড্রাম, বালতি ও অন্যান্য পাত্রে পানি জমতে দেওয়া যাবে না। সাইট নিয়মিত পরিদর্শন করতে হবে।
এলাকাভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণ
প্রতিবেশীদের নিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো, ময়লা অপসারণ এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে মশার প্রজননস্থল সম্পর্কে জানানো দরকার।
ডেঙ্গুর লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন থাকুন
মশার কামড় প্রতিরোধের পাশাপাশি ডেঙ্গুর লক্ষণ চিনে রাখা জরুরি। সাধারণত সংক্রমিত মশার কামড়ের ৪–১০ দিনের মধ্যে লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
সাধারণ লক্ষণগুলো হলো:
- হঠাৎ জ্বর।
- তীব্র মাথাব্যথা।
- চোখের পেছনে ব্যথা।
- শরীর, পেশি ও অস্থিসন্ধিতে ব্যথা।
- বমি বমি ভাব বা বমি।
- ত্বকে লালচে ফুসকুড়ি।
জ্বর হলে ডেঙ্গু হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করতে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা করাতে হবে এবং পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ করতে হবে।
বিপদের লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
ডেঙ্গু টেস্ট করার কিট সরাসরি এখান থেকে অর্ডার করতে পারবেন।
উপসংহার
ডেঙ্গু প্রতিরোধের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো এডিস মশার বংশবিস্তার বন্ধ করা এবং মশার কামড় থেকে নিজেকে রক্ষা করা। এজন্য বাড়ির ভেতরে ও বাইরে জমে থাকা পানি নিয়মিত অপসারণ করতে হবে, পানির পাত্র ঢেকে রাখতে হবে, মশারি ব্যবহার করতে হবে এবং প্রয়োজনে কার্যকর মশা প্রতিরোধক লাগাতে হবে।

Add comment